পাটুলী ফেরিঘাটে লাগামহীন টোল আদায়, চরম হয়রানির শিকার যাত্রী সাধারণ

মোঃ নাদিরুজ্জামান আজমল

সড়ক পথে হাওরের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাথে হাওরবাসীর যোগাযোগের একটি প্রধান পয়েন্ট কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার পাটুলীঘাট । ওখানকার ফেরি পার হয়েই যাতায়াত করতে হয় হাওরবাসীদের। কিন্তু ফেরিঘাটে যানবাহন পারাপারে সরকার নির্ধারিত টোল হার মানা হচ্ছে না, এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা আদায়ের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন চালক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীরা।‎‎তাদের অভিযোগ সরকারি তালিকা অনুযায়ী ৩ টন পর্যন্ত মিনি ট্রাক পারাপারের টোল ৯৫ টাকা হলেও বাস্তবে আদায় করা হচ্ছে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা। কৃষি কাজে ব্যবহৃত ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলারের ক্ষেত্রে ৭৫ টাকার বদলে নেওয়া হচ্ছে প্রায় ৬০০ টাকা। মাইক্রোবাস ও ফোর-হুইল যানবাহনের জন্য নির্ধারিত ৫০ টাকার পরিবর্তে ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।‎‎ব্যক্তিগত সিডান কারের জন্য ৩০ টাকার স্থলে নেওয়া হচ্ছে প্রায় ৪০০ টাকা। অটোরিকশা, সিএনজি ও অন্যান্য ৩/৪ চাকার যানবাহনের ক্ষেত্রে ১৫ টাকার পরিবর্তে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। মোটরসাইকেলের জন্য ৫ টাকার বদলে ৩০ টাকা এবং রিকশা-ভ্যানের ক্ষেত্রে ৫ টাকার পরিবর্তে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।‎‎ভুক্তভোগীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই এই অতিরিক্ত টোল আদায় চললেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।‎‎অটোরিকশা চালক ও সবজি ব্যবসায়ী মালেক মিয়া (৩৫) বলেন, প্রতিদিন পিরোজপুর পাইকারি আড়ৎ থেকে সবজি কিনে অষ্টগ্রামে বিক্রি করি,  ফেরিতে উঠলেই মালামালের ওপর নির্ভর করে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেয়।‎হাওরাঞ্চলের কৃষক মজিবুর রহমান (৩৮) বলেন, বোরো ধান কেটে বাজিতপুরে নিতে গেলে প্রতি গাড়িতে ৮০০ টাকা দিয়েছি গত মৌসুমে এবার তো মনে হয় আরও বেশী দিতে হবে। ‎‎হার্ভেস্টার মালিক রমজান আলী (৫২) জানান, গত মৌসুমে প্রতি হার্ভেস্টার পারাপারে ১৬০০ থেকে ২২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স থেকেও ৬০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।‎প্রাণ কোম্পানির পণ্যবাহী পিকআপ চালক আকাশ মিয়া (২৯) বলেন, ৪০০ টাকা দিতে চাইলেও রশিদ চাইলে উল্টো তেড়ে আসে। পরে ভয়ে টাকা দিয়ে চলে আসি।‎বাজিতপুর থেকে প্রতিদিন অষ্টগ্রাম উপজেলা পরিষদে যাতায়াতকারী এক ব্যক্তি (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, ভাড়া নিয়ে প্রতিদিনই বাকবিতণ্ডা হয়। ঘাটের লোকজনের ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে পারে না। যার কাছ থেকে যেমন ইচ্ছে তেমন ভাড়া নিচ্ছে, প্রতিবাদ করলে মারধরের হুমকি দেয়।‎নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় পাটুলী ঘাটের এক দোকানদার ব্যবসায়ী বলেন, প্রায় প্রতিদিনই ভাড়া নিয়ে চালকদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা হয়, কিন্তু ভয়ের কারণে কেউ মুখ খোলেন না।‎ফেরিঘাটের ইজারাদার বকুল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী বায়েজিদ হোসেন হৃদয় দাবি করেন, তিন বছরের জন্য ইজারা নিলেও পরে অনানুষ্ঠানিকভাবে ঘাটের দায়িত্ব বদরুল আলম শিপু ও পাটুলীর সোহেল উরফে (ফ্রীডম সোহেলের) কাছে হস্তান্তর করেছেন। বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।‎এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কিশোরগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিল মোহাম্মদ ফয়সল বলেন, জনবল সংকটের কারণে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।‎অন্যদিকে ঘাট পরিচালনায় জড়িত সোহেল (ওরফে ফ্রীডম সোহেল) বলেন, সারা দেশেই ফেরিতে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হয়। ঈদের সময় এই হার আরও বাড়ে, কারণ আমাদেরও অতিরিক্ত খরচ থাকে।‎বাজিতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম সোহাগ জানান, ফেরিঘাটটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ পেলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।‎স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত এই অনিয়ম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *