মোঃ নাদিরুজ্জামান আজমল

হাওরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও উন্নয়ন সংকট নিয়ে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবুর একটি ফেসবুক পোস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
“তিন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতায় ডুবছে হাওর” শিরোনামের ওই পোস্টে তিনি হাওরাঞ্চলের স্থায়ী উন্নয়নের জন্য স্বতন্ত্র “হাওর বিষয়ক মন্ত্রণালয়” গঠনের দাবি পুনরায় জোরালোভাবে তুলে ধরেন।
গত ১৪ মে ২০২৬ তারিখে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া পোস্টে চেয়ারম্যান বাবু সাম্প্রতিক বাঙ্গালপাড়া এলাকার ভয়াবহ নদী ভাঙন ও সড়ক বিলীনের ঘটনা তুলে ধরে বলেন, হাওরাঞ্চলের সংকট মোকাবিলায় বিদ্যমান মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবের কারণেই আজ হাজার কোটি টাকার সম্পদ হুমকির মুখে পড়েছে।
পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন,“আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান ভাই যখন অষ্টগ্রাম-চাতলপার সড়কসহ বিভিন্ন গ্রাম ভাঙনের হাত থেকে রক্ষায় এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ে যান, তখন তাঁকে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে কথা বলতে বলা হয়। আবার পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে গেলে সেখান থেকে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়। এই তিন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা ও আমলাতান্ত্রিক ফাইল চালাচালির বিড়ম্বনার মাশুল দিতে গিয়ে আজ আমাদের প্রায় হাজার কোটি টাকার ঘরবাড়ি, রাস্তা ও সম্পদ নদীগর্ভে বিলীন হতে চলেছে।”তিনি আরও বলেন,“আজ যদি একটি স্বতন্ত্র ‘হাওর মন্ত্রণালয়’ থাকত, তবে তিন মন্ত্রণালয়ে দৌড়াদৌড়ি না করে একক নির্দেশেই তাৎক্ষণিক ভাঙনরোধে কাজ শুরু করা যেত। হাওরের বাঁধ, সড়ক, কৃষি ও কৃষকের নিরাপত্তা একই ছাতার নিচে পরিচালিত হতো। হাওরের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য যেহেতু দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে আলাদা, তাই এর সমস্যার সমাধানও হতে হবে স্বতন্ত্র।”
এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু প্রথমবারের মতো “হাওর বিষয়ক মন্ত্রণালয়” গঠনের দাবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট দেন।
পরে ২৩ ফেব্রুয়ারি “প্রধানমন্ত্রী বরাবর খোলা চিঠি” শিরোনামে আরও একটি পোস্ট করে বিষয়টি জাতীয়ভাবে আলোচনায় আনেন।
তার এই উদ্যোগ সে সময় বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে অষ্টগ্রাম উপজেলা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান চেয়ারম্যান বাবুর এই প্রস্তাবের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন,“আপনাদের চেয়ারম্যান, আমার ভাই বাবু ‘হাওর মন্ত্রণালয়’ গঠনের যে দাবিটি তুলেছে, সেটি অত্যন্ত যৌক্তিক। আমি জাতীয় সংসদে বিষয়টি তুলে ধরব।”কথামতো গত ২৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান হাওরাঞ্চল রক্ষায় স্বতন্ত্র “হাওর বিষয়ক মন্ত্রণালয়” গঠনের দাবি উত্থাপন করেন। এরপর থেকেই বিষয়টি হাওরাঞ্চলে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
চেয়ারম্যান বাবু তার পোস্টে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—এই সাত জেলার হাওরাঞ্চলভিত্তিক সকল সংসদ সদস্যকে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে হাওরাঞ্চলের স্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি ৯ দফা দাবি উপস্থাপন করেন।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, স্বতন্ত্র হাওর মন্ত্রণালয় গঠন, স্থায়ী ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ, নদী-খাল পুনঃখনন, কৃষির আধুনিকায়ন, কৃষক-জেলেদের নিরাপত্তা, নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ, বিশেষায়িত শিক্ষা ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন উন্নয়ন।
ফেসবুক পোস্টের শেষাংশে তিনি নিজেকে “জনগণের সাধারণ একজন কর্মচারী” উল্লেখ করে বলেন, হাওরবাসীর এই যৌক্তিক দাবিগুলো যদি সাত জেলার সংসদ সদস্যরা সম্মিলিতভাবে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপস্থাপন করেন, তাহলে হাওরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
