এটিভি অনলাইন ডেস্ক

কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা অষ্টগ্রামের কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ঐতিহ্যবাহী ধলেশ্বরী নদী খনন করার মাত্র এক বছরের মাথায় পুনরায় ভরাট হয়ে তলদেশে পলি ও বালু জমে নাব্য হারিয়ে ফেলেছে। নদীর খননকৃত মাটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া সত্ত্বেও এভাবে দ্রুত ভরাট হয়ে যাওয়ায় স্তম্ভিত স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।
নদীটি দ্রুত ভরাট হওয়ার নেপথ্যের কারণ সম্পর্কে জানতে কথা হয় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর উপসহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শরিফুল ইসলামের সঙ্গে। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, উজান থেকে বাংলাবাজারের দিক থেকে আসা বিভিন্ন খাল বেয়ে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢল ও প্রবল স্রোতের সঙ্গে প্রচুর পলি ও বালু এসে নদীর মুখে জমা হয়।
কনসালটেন্ট দিয়ে স্টাডি করে দেখা গেছে, এখানে পলি জমার (সিলট্রেশন) হার বা প্রবণতা প্রায় ৩০০ শতাংশ! বিগত এক-দুই বছর যাবত দেখা যাচ্ছে, নদী খনন করার পর এক মাসও তা টেকে না; ওপর থেকে আসা পলিতে তা দ্রুত ভরাট হয়ে যায়। নদীগুলোর এই ভৌগোলিক ও অববাহিকাভিত্তিক বাস্তবতায় কেবল একবার ড্রেজিং করে স্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্থায়ী বলতে এ ধরনের নদী এভাবে সারা বছর ড্রেজিং করে রাখা লাগে। তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের এই প্রক্রিয়াটি বাস্তবে জনবল ও বিপুল খরচের কারণে বেশ জটিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
হাওরের নদীগুলোর ওপর এই অনিয়মিত ড্রেজিংয়ের নেতিবাচক প্রভাব ও টেকসই সমাধান নিয়ে কথা বলেন সামাজিক ও পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ‘হাওরাঞ্চলবাসী ঢাকা’-র সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান বাবু। তিনি অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে বলেন, হাওর অঞ্চল এবং এর নদীগুলোকে একক সত্তা হিসেবে না দেখে সামগ্রিক ও সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করতে হবে। ভৌগোলিক ও অনন্য বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এই অঞ্চলের নদীগুলো পাহাড় থেকে উৎপত্তি হয়ে হাওর পেরিয়ে সাগরে মিশেছে। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, কোনো ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণা বা সমীক্ষা ছাড়াই যত্রতত্র নদী ও শাখা-উপশাখা ড্রেজিং করা হচ্ছে এবং ইচ্ছেমতো নদীর গতিপথ পরিবর্তন বা ভরাট করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে নদীগুলোর ওপর এক ধরনের নির্মম অত্যাচার চলছে, যার ব্যতিক্রম নয় আমাদের ধলেশ্বরী নদীটিও।
তিনি আরও বলেন, হাওরাঞ্চলবাসীর পক্ষ থেকে আমরা স্পষ্টভাবে মনে করি, বিচ্ছিন্নভাবে খণ্ড খণ্ড ড্রেজিং না করে পুরো হাওর অঞ্চলকে একসঙ্গে নিয়ে একটি ব্যাপকভিত্তিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সমীক্ষা চালানো দরকার। কোথায় প্রকৃত ড্রেজিং প্রয়োজন, কোথায় গতিপথ পরিবর্তন করতে হবে কিংবা কোথায় তা করা যাবে না—তা বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। যত্রতত্র অপরিকল্পিত ড্রেজিং অবিলম্বে বন্ধ করে পরিকল্পিত ও টেকসই পদক্ষেপে নদীগুলোকে রক্ষা করার এখনই উপযুক্ত সময়।
এদিকে সামনেই হাওরের একমাত্র প্রধান ফসল বোরো ধান আবাদের ধুম পড়বে। হাওরঞ্চলের হাজার হাজার একর ফসলি জমি এই ধলেশ্বরী নদীর পানির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে। সেচ মৌসুমের ঠিক মুখে নদীটি শুকিয়ে চর জেগে ওঠায় কৃষকরা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। নদীর পানিপ্রবাহ না থাকলে নদীভিত্তিক সেচপাম্পগুলো অকেজো হয়ে পড়বে, যার ফলে হাজার হাজার একর জমির বোরো আবাদ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এছাড়া নদী ভরাট হওয়ার কারণে দেশীয় প্রজাতির মাছের অভয়াশ্রম ও স্বাভাবিক প্রজননক্ষেত্রও ধ্বংসের মুখে পড়েছে, যা স্থানীয় মৎস্যজীবীদের জীবিকায় চরম আঘাত হানছে।
অন্যদিকে, শুধু কৃষিতেই নয়, অষ্টগ্রাম উপজেলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগব্যবস্থাও এই নদীপথের ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। সংলগ্ন বাণিজ্যিক হাব ভৈরব থেকে অষ্টগ্রাম বাজার, কাস্তুল বাজারসহ আশপাশের বিভিন্ন হাটে স্বল্প খরচে নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল ও পণ্যদ্রব্য পরিবহনের একমাত্র অর্থনৈতিক মাধ্যম হলো এই ধলেশ্বরী নদী। নাব্য সংকটের কারণে পলি জমে নদীর নদীর বিভিন্ন অংশ ডুবোচরে পরিণত হওয়ায় ভৈরব থেকে আসা পণ্যবাহী বড় বড় ট্রলার ও নৌকাগুলো আর ঘাটে ভিড়তে পারছে না। এতে পণ্য খালাস ও পরিবহনে সময় যেমন বেশি লাগছে, তেমনি খরচও বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে—যার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বাজার ও সাধারণ ভোক্তার ওপর। পাশাপাশি ঘাটগুলোতে যাত্রী চলাচলেও পোহাতে হচ্ছে মারাত্মক দুর্ভোগ।
স্থানীয় প্রবীণ কৃষক, ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিক সমাজ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, হাওর এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা সম্পূর্ণভাবে নদীর ওপর নির্ভরশীল। নদী না বাঁচলে হাওরের কৃষি ও অর্থনীতি দুটোই থমকে যাবে। ধলেশ্বরী নদীকে সচল রাখতে এবং হাজার হাজার একর ফসলি জমি ও কোটি টাকার বাণিজ্য রক্ষায় অপরিকল্পিত ড্রেজিং বন্ধ করে দীর্ঘমেয়াদি ও পরিবেশবান্ধব সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
