৫০ শয্যার হাসপাতালে শয্যা ব্যবহারের হার শতভাগের বেশি, ২০২৫ সালে বহির্বিভাগে সেবা নিয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজারের বেশি রোগী।
বিশেষজ্ঞ স্ত্রীরোগ চিকিৎসক নেই, চার মিডওয়াইফের বিপরীতে কর্মরত একজন।
মোঃ নাদিরুজ্জামান আজমল

কিশোরগঞ্জের হাওর অধ্যুষিত অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও সহায়ক জনবলের তীব্র সংকটে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে অনুমোদিত ৩৩টি চিকিৎসক পদের মধ্যে ২২টিই শূন্য।
অন্যদিকে, ২২টি সহায়ক কর্মচারীর পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র দুজন। চিকিৎসকসংকটের পাশাপাশি নার্স ও অন্যান্য কর্মীর ঘাটতিতে বাড়ছে সেবার ওপর চাপ। বিশেষজ্ঞ স্ত্রীরোগ চিকিৎসক না থাকায় মাতৃস্বাস্থ্যসেবা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ৩৭ জন রোগী। একই বছর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬ হাজার ৬৫৯ জন। এদিকে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত শয্যা ব্যবহারের হার ছিল শতভাগের বেশি।
বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপের বিপরীতে প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত না হওয়ায় হাওরাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

চিকিৎসকের ৩৩ পদের ২২টিই শূন্যহাসপাতালের জনবল সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকের ৩৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১১ জন। শূন্য রয়েছে ২২টি পদ, যা মোট পদের প্রায় ৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ চিকিৎসক পদই শূন্য।
এ ছাড়া ১১টি কনসালট্যান্ট পদ এবং একটি আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা পদ শূন্য রয়েছে বলে জানা যায়।
এ অবস্থায় সীমিতসংখ্যক চিকিৎসককে বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও ভর্তি রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে। হাওরাঞ্চলের দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে স্থানীয় হাসপাতালটির ওপর নির্ভরশীলতা বেশি। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক না থাকলে রোগীদের ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সহায়ক জনবলে ঘাটতি প্রায় ৯১ শতাংশচিকিৎসকের পাশাপাশি সহায়ক কর্মচারীর সংকটও প্রকট। অনুমোদিত ২২টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র দুজন। শূন্য রয়েছে ২০টি পদ, অর্থাৎ ঘাটতির হার প্রায় ৯০ দশমিক ৯ শতাংশ।

জানা যায়, আয়া, বাবুর্চি, মালি, ওয়ার্ডবয়, ফার্মাসিস্ট ও এক্স-রে টেকনিশিয়ানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবলসংকট রয়েছে।এ ছাড়া হাসপাতালের বিভিন্ন কার্যক্রম সচল রাখতে ১৫ জন কর্মীর প্রয়োজনীয়তার কথা জানানো হলেও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কাজ করছেন ১০ জন। বাকি পাঁচজন অন্যত্র সংযুক্তিতে রয়েছেন।
নার্সিং বিভাগেও রয়েছে জনবলসংকট। ৩০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৯ জন। শূন্য রয়েছে ১১টি পদ। চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মীর ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।রোগীর চাপ বাড়ছে, শয্যা ব্যবহারের হার শতভাগের বেশি।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৫৭২ জন। ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৯১৪ জনে। ২০২০ সালে এ সংখ্যা কমে ২ হাজার ৫১৮ জন হলেও পরবর্তী সময়ে আবার বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৯২৬ জন। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৬৫৯ জনে। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫ হাজার ৯৫৬ জন।
শয্যা ব্যবহারের হারও হাসপাতালের ওপর বাড়তি চাপের চিত্র উঠে এসেছে, তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শয্যা ব্যবহারের হার ছিল ১০৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ, ২০২৪ সালে ১০৪ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ১০৪ দশমিক ৪২ শতাংশ।
অন্যদিকে, বহির্বিভাগে রোগীর সংখ্যা ২০১৭ সালের ৪৮ হাজার ৫৩৪ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৩৭ জনে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসেই বহির্বিভাগে সেবা নিয়েছেন ১৫ হাজার ৮১৩ জন।
জরুরি বিভাগেও রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্য। ২০১৭ সালে এ বিভাগে সেবা নিয়েছিলেন ৫ হাজার ৮৩০ জন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৫০১ এবং ২০২৫ সালে ১৩ হাজার ২২৬ জন। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত জরুরি বিভাগে সেবা নিয়েছেন ১২ হাজার ৪৭৩ জন।

অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিশেষজ্ঞ স্ত্রীরোগ চিকিৎসক না থাকায় মাতৃস্বাস্থ্যসেবা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। চারটি মিডওয়াইফ পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এখানে ৯৩৫টি এবং ২০২৫ সালে ৮০৫টি স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হয়েছে। বিপুলসংখ্যক প্রসূতিকে সেবা দিতে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল ও জরুরি চিকিৎসাসুবিধা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
হাওরাঞ্চলের দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে জটিল প্রসূতি রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র নেওয়া অনেক সময় কঠিন হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, পর্যাপ্ত মিডওয়াইফ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জরুরি প্রসূতিসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
ওষুধের বরাদ্দ ও চাহিদার হিসাবহাসপাতালের ওষুধের চাহিদা, বরাদ্দ ও সরবরাহের বিষয়টিও পর্যালোচনার দাবি রাখে। সরবরাহ করা হিসাব অনুযায়ী, ভর্তি রোগীদের ৮০ শতাংশের জন্য স্যালাইন ও ইনজেকশনযোগ্য অ্যান্টিবায়োটিকের সম্ভাব্য বার্ষিক ব্যয় যথাক্রমে ৩৫ লাখ ৪ হাজার টাকা ও ৪৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এ দুই খাতে মোট সম্ভাব্য ব্যয় ৭৮ লাখ ৮৪ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইডিসিএল ও স্থানীয় দরপত্র মিলিয়ে ওষুধের জন্য বরাদ্দ বা প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ৭৮ লাখ ৩ হাজার ৫৩০ টাকা।রাজস্ব জমা বাড়লেও সেবার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরিহাসপাতালের ব্যবহারকারী ফি থেকে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া অর্থের পরিমাণও বেড়েছে।
হাস্পাতাল থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০২২ সালে এ খাতে জমা ছিল ২ লাখ ২৫ হাজার ৩৯৪ টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ লাখ ৭০ হাজার ৮৮৯ টাকায়। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জমার পরিমাণ ছিল ১২ লাখ ৬৮ হাজার ৫৯৫ টাকা।
দায়িত্বে ডা. সৌরভ, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা ও স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখার দায়িত্বে রয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাহ মো. মহিবুল্লাহ সৌরভ। তবে চিকিৎসক ও সহায়ক জনবলের দীর্ঘদিনের ঘাটতি নিরসনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
হাওরাঞ্চলের মানুষের জন্য এ হাসপাতাল একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। তাই শূন্য পদ পূরণ, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, ওষুধের চাহিদা ও সরবরাহের স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করা এবং জরুরি ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে হাসপাতালের জনবল, সেবার মান ও ওষুধ ব্যবস্থাপনা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিলে অষ্টগ্রামসহ হাওরাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ আরও উন্নত হতে পারে।
এ বিষয়ে অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাহ মো. মহিবুল্লাহ সৌরভ এটিভি অনলাইনকে বলেন, “হাসপাতালের জনবলসংকটের বিষয়টি নিয়মিতভাবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তবে হাসপাতালে পর্যাপ্ত আবাসনব্যবস্থা না থাকায় চিকিৎসক ও নার্সরা এখানে থাকতে আগ্রহী হন না।
পাশাপাশি হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করাও জরুরি। দুই পক্ষের মধ্যে মারামারির ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে আনা হলে অনেক সময় হাসপাতালের ভেতরেও তাদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
জেলা শহরের সঙ্গে অষ্টগ্রামের সরাসরি ও সহজ যোগাযোগব্যবস্থা না থাকায় জটিল রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র স্থানান্তর করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে এখানে অস্ত্রোপচার করাতেও অনেকে আগ্রহী হন না।
হাওরাঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান ও যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে জরুরি রোগীদের দ্রুত স্থানান্তর করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে মুমূর্ষু রোগী, জটিল প্রসূতি ও দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত জেলা শহরের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালু করা প্রয়োজন।
অক্সিজেন, প্রয়োজনীয় জরুরি চিকিৎসাসরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত কর্মীসমৃদ্ধ নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা গেলে জরুরি রোগীদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তর সহজ হবে।
হাসপাতালের জনবলসংকট নিরসনে চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা, হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদার, শূন্য পদ পূরণ এবং হাওরাঞ্চলের উপযোগী জরুরি রোগী পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
জেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া গেলে রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সহজ হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবলসংকট অনেকটাই কমে আসবে এবং হাওরাঞ্চলের মানুষ আরও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাবেন বলে আমি আশা করি।”
