অপরিকল্পিত নদী খননের খেসারত দিচ্ছে অষ্টগ্রাম

নাদিরুজ্জামান আজমল

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলায় অপরিকল্পিত নদী খননের খেসারত দিতে হচ্ছে স্থানীয় জনপদের মানুষকে। ধলেশ্বরী-মেঘনার সংযোগস্থল গজিয়া খালে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দেওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৭কিঃমিঃ বাঙালপাড়া- নোয়াগাঁও সড়ক। যা বর্তমানে ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কারাধীন। একই সঙ্গে ঝুঁকিতে রয়েছে বাঙালপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের নবনির্মিত ভবন, বাঙালপাড়া বাজার এবং খালপাড়ের শতাধিক বসতভিটা। ভাঙন অব্যাহত থাকলে নোয়াগাঁও গ্রামের প্রায় এক হাজার পরিবার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।‎‎

শনিবার সকালে সরেজমিনে উপজেলার বাঙালপাড়া ইউনিয়নের গজিয়া খালের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে বাজার থেকে উছমানপুর পর্যন্ত এলাকা ঘুরে দেখা যায়, খালের তীরজুড়ে বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে বিশাল অংশের মাটি ধসে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। প্রবল স্রোতের টানে ভাঙন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।‎‎স্থানীয়দের অভিযোগ, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর লাউড়া-মাইজখোলা এলাকায় অপরিকল্পিত নদী খনন এবং নাব্যতা সংকটের কারণে গজিয়া খালে পানির চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এতে সৃষ্টি হওয়া তীব্র স্রোতে গত এক সপ্তাহে প্রায় ৪০০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।‎‎এলাকাবাসীর দাবি, ভাঙনের শুরুতেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হলেও সময়মতো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।‎‎

জানা গেছে, সাত কিলোমিটার দীর্ঘ বাঙালপাড়া-নোয়াগাঁও সড়কটি সাত বছর আগে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। বর্তমানে সড়কটির সংস্কারকাজে আরও ১৩ কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। কিন্তু সংস্কারকাজ চলাকালেই সড়কের একাধিক অংশ ভাঙনের মুখে পড়েছে।‎‎সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, এই সড়কের শেষ প্রান্তে ১৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন নোয়াগাঁও-চাতলপাড় সেতু প্রকল্প।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংযোগ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো প্রকল্পের কার্যকারিতাই প্রশ্নের মুখে পড়বে।‎‎বাঙালপাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “ভাঙন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এলজিইডি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিলে আজ এই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতো না।”‎‎নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা ফারুক হোসেন বলেন, “সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যাতায়াতে মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে। মুমূর্ষু রোগীদের সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ না থাকলে মোবাইল চার্জ দিতেও দূরে যেতে হয়। আমরা এখন চরম দুর্ভোগে আছি।

”‎‎স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান রুস্তম বলেন, সড়কের শেষ প্রান্তে ১৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বৃহৎ সেতু নির্মাণাধীন রয়েছে। সেতুটি চালু হলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটবে। কিন্তু সংযোগ সড়কটিই যদি নদীগর্ভে চলে যায়, তবে এই বিপুল বিনিয়োগ কোনো কাজেই আসবে না। বিষয়টি গত বছরও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলাম।‎‎এদিকে পরিস্থিতির দায় নিতে নারাজ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। উল্টো দুই সংস্থা একে অপরকে দোষারোপ করছে।‎‎

অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রকৌশলী মো. মোজাম্মেল হক বলেন, ভাঙন শুরুর পরপরই পানি উন্নয়ন বোর্ডকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছিল। তারা সময়মতো জিও ব্যাগ ফেলে নদীশাসনের ব্যবস্থা নিলে ক্ষয়ক্ষতি এতটা বাড়তো না। এখনো দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।‎‎তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজাদ হোসেন বলেন, শুরুতে আমাদের কাছে কোনো লিখিত বা মৌখিক তথ্য ছিল না। আগে জানানো হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হতো। বর্তমানে ভাঙন তীব্র রূপ নিয়েছে। সরেজমিন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।‎‎এলাকাবাসীর মতে, মেঘনা নদীর মুখে পরিকল্পিত ড্রেজিং ও জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে স্থায়ী নদীশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই সড়কসহ আশপাশের জনপদ রক্ষা করা সম্ভব।‎‎তাদের অভিযোগ, দায়সারা আশ্বাসে কাজ হবে না। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অষ্টগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সরকারের শত কোটি টাকার উন্নয়ন বিনিয়োগও হুমকির মুখে পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *