মৃত্যুর পর নয়, জীবিত থাকতেই ‘চল্লিশা’

৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮ হাজার মানুষের মুখে খাবার তুলে দিলেন হোসেনপুরের রফিকুল

স্টাফ রি‌পোর্টার, কি‌শোরগঞ্জ থেকে_

মৃত্যুর পর স্বজনেরা তাঁর জন্য দোয়া করবেন, আয়োজন করবেন মিলাদ-মাহফিল কিংবা ‘চল্লিশা’। কিন্তু সেই আয়োজনের দিনটিতে তিনি থাকবেন না—এই ভাবনাই যেন কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরের রফিকুল ইসলামের মনে গভীর রেখাপাত করে।

তাই মৃত্যুর পরের অপেক্ষায় না থেকে জীবিত থাকতেই নিজের ‘চল্লিশা’র আয়োজন করলেন ৬২ বছর বয়সী এই ব্যক্তি।সামিয়ানা টানানো হলো, সাজানো হলো চেয়ার-টেবিল। রান্না হলো নানা পদের খাবার। আর সেই খাবার খেতে একে একে জড়ো হলেন এলাকার মানুষ।

প্রায় ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রায় ৮ হাজার মানুষকে খাওয়ালেন রফিকুল ইসলাম। তাঁদের মধ্যে ছিলেন দরিদ্র, অসহায় ও নিম্নআয়ের বহু মানুষ।বৃহস্পতিবার হোসেনপুর উপজেলার একটি গ্রামে দিনব্যাপী চলে এই ব্যতিক্রমী আয়োজন।

খাবারের তালিকায় ছিল গরুর মাংস, মাছের মুড়িঘণ্ট, ডাল ও পায়েস। ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগকে ঘিরে সকাল থেকেই এলাকায় তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকার নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন আয়োজনে।রফিকুল ইসলাম ওই গ্রামের মৃত হাতেম আলীর ছেলে। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তাঁর উপলব্ধি—মৃত্যুর পর মানুষের স্মরণে কোনো আয়োজন হওয়ার অপেক্ষায় থাকার চেয়ে জীবিত থাকতেই মানুষের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এবং অসহায় মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়া অনেক বেশি তৃপ্তির। সেই ভাবনা থেকেই নিজের ‘চল্লিশা’ নিজেই আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও এলাকার মানুষের দোয়া পাওয়ার আশায় এবং পরকালের সওয়াবের প্রত্যাশায় মৃত্যুর আগেই এই আয়োজন করেছি। আমার ইচ্ছা ছিল, আমি নিজে বেঁচে থাকতেই সবার হাতে খাবার তুলে দেব।

’তিনি বলেন, মৃত্যুর পর কে কীভাবে তাঁর জন্য আয়োজন করবেন, তা তিনি জানেন না। তবে জীবিত অবস্থায় নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগটি তিনি হারাতে চাননি।

রফিকুল ইসলামের চাচাতো ভাই মো. শামীম হোসেন বলেন, ‘এ ধরনের আয়োজন আমাদের এলাকায় আগে কখনো দেখা যায়নি। রফিকুল ভাই নিজের জন্য যে আয়োজন করেছেন, সেটি আসলে মানুষের জন্যই করেছেন। সবাই উৎসবমুখর পরিবেশে আনন্দের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়ায় অংশ নিয়েছেন।

’স্থানীয় সূত্র জানায়, মৃত্যুর পর প্রচলিত ‘চল্লিশা’র পরিবর্তে জীবিত থাকতেই ভোজ আয়োজনের সিদ্ধান্তের কথা রফিকুল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ করেন। এরপর থেকেই বিষয়টি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। নির্ধারিত দিনে তাঁর বাড়ি ও আশপাশের এলাকায় মানুষের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো।

রফিকুল ইসলাম জানান, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের রাস্তার পাশে নির্মাণাধীন দোকান ও জমির একটি বড় অংশ থেকে পাওয়া প্রায় ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা থেকে তিনি এই আয়োজনের অর্থ ব্যয় করেছেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, পুরো আয়োজন করতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯ লাখ টাকা।

ব্যতিক্রমী এই আয়োজন ঘিরে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। তবে কৌতূহলের আড়ালে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে, তা হলো—মৃত্যুর পর মানুষ তাঁকে স্মরণ করবে, এমন আশায় বসে থাকেননি রফিকুল। বরং জীবিত থাকতেই মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে একই কাতারে বসেছেন, নিজের সামর্থ্যের অংশ ভাগ করে নিয়েছেন এবং চেয়েছেন তাঁদের দোয়া।

স্থানীয়দের অনেকের কাছে এটি তাই নিছক কোনো ভোজের আয়োজন নয়; বরং জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে মানুষের ভালোবাসা ও দোয়া পাওয়ার এক অনন্য প্রয়াস। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মুখে একবেলা খাবার তুলে দিয়ে তাঁদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার এই উদ্যোগকে মানবিক দৃষ্টান্ত হিসেবেই দেখছেন অনেকে।

মৃত্যু অনিবার্য—কিন্তু মৃত্যুর আগে মানুষ কী রেখে যায়, সেটিই হয়তো শেষ পর্যন্ত হয়ে থাকে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। রফিকুল ইসলামের এই আয়োজন সেই কথাটিই যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিল—মৃত্যুর পর স্মরণ করার অপেক্ষায় না থেকে বেঁচে থাকতেই মানুষের জন্য কিছু করে যাওয়ার আনন্দই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *