নিজস্ব প্রতিনিধি

কিশোরগঞ্জের হাওড়াঞ্চলের প্রাণপ্রবাহ ধনু নদী। এই নদীপথেই প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মালবাহী নৌযান চলাচল করে। অথচ সেই নদী এখন যেন চাঁদাবাজদের অভয়ারণ্য।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি প্রকাশ্যে চাঁদা আদায়ে জড়িয়ে পড়েছে নৌ-পুলিশের একটি অংশও। ফলে বছরের পর বছর ধরে অসহায় হয়ে পড়েছেন হাজারো নৌযান মালিক, মাঝি-মাল্লা ও ব্যবসায়ীরা। অভিযোগ করলেও প্রতিকার মিলছে না; বরং ভয়ে অধিকাংশই মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
সম্প্রতি জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার সুতাপাড়া ইউনিয়নের চংনোয়াগাঁও এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে এমন ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। নদীর তীরে একটি ছোট নৌকায় অপেক্ষমাণ কয়েকজন পুলিশ সদস্য। আশপাশে কোনো মালবাহী নৌযান দেখা দিলেই দ্রুত সেটির দিকে ছুটে যায় নৌকাটি।
চলন্ত লঞ্চ, কার্গো কিংবা বাল্কহেড থেকে টাকা সংগ্রহ করে পুলিশের নৌকায় বসে থাকা এক কর্মকর্তার হাতে তুলে দেয় কয়েকজন কিশোর। মুহূর্তের মধ্যেই তারা আবার ছুটে যায় পরবর্তী নৌযানের দিকে। একই সময় নদীর কিছুটা দূরে স্থানীয় চিহ্নিত চাঁদাবাজরাও আরেকটি ছোট নৌকায় করে একের পর এক নৌযান থামিয়ে চাঁদা তুলতে দেখা যায়।
হাওড়ের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত করিমগঞ্জ উপজেলার চংনোয়াগাঁও থেকে ইটনা উপজেলার টেজেরঘাট পর্যন্ত বিস্তীর্ণ নদীপথে দিনের আলোতেই চলে এই চাঁদাবাজি।
চামড়াঘাট সংলগ্ন ধনু নদী হয়ে প্রতিদিন সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও আশুগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত আট থেকে দশ হাজার নৌযান চলাচল করে। এসব নৌযানে পরিবহন করা হয় কয়লা, পাথর, বালু, বাঁশসহ বিভিন্ন পণ্য। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে ঘাটে ঘাটে গুনতে হয় মোটা অঙ্কের চাঁদা।
নৌযানের মাঝি-মাল্লা ও স্থানীয়দের অভিযোগ, চংনোয়াগাঁও গ্রামের কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী দীর্ঘদিন ধরে এই চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে চালকদের মারধর, লাঞ্ছিত করা এবং মালামাল লুটের ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। তাদের সঙ্গে নৌ-পুলিশের সুসম্পর্ক থাকায় কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পান না।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতিটি মালবাহী নৌযান থেকে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়। হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চাঁদাবাজ চক্র। নদীপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে নৌ-পুলিশের সাতটি থানা ও ফাঁড়ি থাকলেও প্রকাশ্য এই চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
স্থানীয়দের দাবি, চাঁদাবাজ চক্রের মূল হোতাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলেও তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বরং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে পুলিশের একটি অংশের সঙ্গে তাদের যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে।
ঢাকার নিউ সান ওয়ান নামের একটি নৌযানের চালক পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, “বালিখলা ও নওগাঁও এলাকার কয়েকজন চাঁদাবাজ প্রতিনিয়ত নৌযান আটকিয়ে টাকা আদায় করছে। টাকা দিতে না চাইলে লাঠি ও রড দিয়ে মারধর করে, এমনকি মালামালও লুট করে নেয়। আমরা অসহায়।
”নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রমিক ইউনিয়নের এক নেতা বলেন, “নদীতে চাঁদাবাজির বিষয়টি নৌ-পুলিশকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তারা বিষয়টি এড়িয়ে গেছে।”নদীতীরবর্তী এলাকার অনেক বাসিন্দাই চাঁদাবাজদের ভয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি।
তবে ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, কোনো নৌযান চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই হামলা, মারধর ও মালামাল লুটের ঘটনা ঘটছে অহরহ। ফলে নদীপথে চলাচলকারী মাঝি-মাল্লাদের কাছে প্রতিবাদ করাটাও যেন অপরাধে পরিণত হয়েছে।
গত মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রাত প্রায় ১০টার দিকে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার সুতারপাড়া ইউনিয়নের নোয়াগাঁও সুইজগেট এলাকায় ঘটে যায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। হাওরের নিস্তব্ধ রাত। একটি নৌকায় ১৫ দিনের এক শিশুর নিথর দেহ নিয়ে স্বজনরা ফিরছিলেন শেষ বিদায়ের পথে। শোকের ভারে নীরব সেই যাত্রাও শেষ পর্যন্ত নিরাপদ থাকেনি। পথরোধ করে একদল দুর্বৃত্ত। নৌকায় শিশুর মরদেহ রয়েছে এ কথা জানিয়ে বারবার অনুরোধ করা হলেও তাতে কোনো সাড়া মেলেনি। ভয়ভীতি দেখিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, নগদ টাকা এবং নৌকার সোলার প্যানেলের ব্যাটারি নিয়ে যায় তারা।
মানবিকতার সীমা অতিক্রম করা এ ঘটনায় হাওরাঞ্চলের নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনাটি রাতে সংঘটিত হওয়ায় অনেকে একে ডাকাতি হিসেবে বর্ণনা করছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একই ধরনের ঘটনা দিনের বেলায় ঘটলে সেটিকে অনেক সময় চাঁদাবাজি হিসেবে অভিহিত করা হয়; রাতে সংঘটিত হওয়ায় সেটি ডাকাতি হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
তবে ঘটনার আইনি সংজ্ঞা যা-ই হোক, জনমনে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে জোরালো হয়ে উঠেছে, তা হলো নৌপথে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর কার্যকর উপস্থিতি কোথায়?
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, করিমগঞ্জ নৌ পুলিশের অস্তিত্ব কাগজে-কলমে থাকলেও হাওরের নৌপথে তাদের টহল বা দৃশ্যমান কার্যক্রম খুব কমই চোখে পড়ে। ফলে অপরাধীরা সুযোগ নিচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ নিজেদের নিরাপত্তাহীন মনে করছেন।
তাদের দাবি, নৌপথে নিয়মিত টহল, কার্যকর নজরদারি এবং অপরাধ দমনে দৃশ্যমান উদ্যোগ না বাড়ালে এ ধরনের ঘটনা রোধ করা কঠিন হবে।
এ ঘটনার পর এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে হাওরাঞ্চলের নৌপথে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে, যাতে শোকাহত মানুষের শেষযাত্রাও আর কোনো দিন সন্ত্রাসের মুখোমুখি না হয়।
অন্যদিকে যদিও স্থানীয়দের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন করিমগঞ্জের চামড়াঘাট নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচাজ করিমগঞ্জ নৌ-পুলিশের ইনচার্জ মো. শাহ সিকান্দার বলেন, “সরকারি পোশাক বা সরকারি পরিচয়পত্র ব্যবহার করে যাতে কেউ অবৈধভাবে চাঁদাবাজি করতে না পারে, সে বিষয়ে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছি এবং প্রতিরোধে নিয়মিত তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছি। আমার জানা মতে, চামটা ঘাট বন্দরে বর্তমানে এ ধরনের কোনো চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে না।
নির্বিকার থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে করে বলেন তা সঠিক সঠিক নয়। আমাদের টহল নিয়মিত জোরদার রয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
