এম এ কাদের, বিশেষ প্রতিনিধি:

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। উপজেলার ১৪৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭৭টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। একই সঙ্গে সহকারী শিক্ষকের ৬৪টি পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক ছাড়াই প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান চালিয়ে নিতে হচ্ছে অনেক বিদ্যালয়কে। এতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম, বাড়ছে প্রশাসনিক জটিলতা এবং শিক্ষার মান নিয়েও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।

উপজেলা শিক্ষা অফিস ও বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, মাধবপুরে বর্তমানে প্রধান ও সহকারী শিক্ষক মিলিয়ে মোট ১৪১টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষকের ৭৭টি এবং সহকারী শিক্ষকের ৬৪টি পদ। প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদগুলোর মধ্যে ৩৪টি বিদ্যালয়ে চলতি দায়িত্বে এবং ৪৩টি বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
শিক্ষক সংকটের সবচেয়ে করুণ চিত্র দেখা গেছে উপজেলার ছাতিয়াইন ইউনিয়নের রামেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়টিতে ২২৯ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে কর্মরত শিক্ষক মাত্র দুজন। ছয়টি অনুমোদিত পদের মধ্যে প্রধান শিক্ষকসহ চারটি পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মহিতোষ চন্দ্র সূত্রধর বলেন, ‘দুইজন শিক্ষক দিয়ে ছয়টি শ্রেণির পাঠদান চালিয়ে নিতে হচ্ছে। কোনো শিক্ষক ছুটিতে গেলে কিংবা প্রশিক্ষণ ও সভায় অংশ নিতে গেলে একজন শিক্ষককেই পুরো বিদ্যালয় সামলাতে হয়। এতে শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’

তিনি জানান, ২০১৮ সালের মার্চ থেকে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। পরবর্তীতে কয়েকজন সহকারী শিক্ষক বদলি ও চাকরি ছেড়ে দেওয়ায় শিক্ষক সংকট আরও তীব্র হয়েছে।একই চিত্র উপজেলার বুল্লা ইউনিয়নের মাঝিশ্বাইর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ছয়টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে সরকারি শিক্ষক রয়েছেন মাত্র একজন। পাঠদান সচল রাখতে অন্য বিদ্যালয় থেকে দুজন শিক্ষককে প্রেষণে এনে দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে। বদলি, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা ও ছুটির কারণে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক সংকট চরমে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে বিদ্যালয় সূত্র।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, শিক্ষক বদলি হওয়ার পর শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ না করায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ক্ষতি হচ্ছে। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে শিশুদের শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির মাধবপুর উপজেলা শাখার সহ-সভাপতি হেফজুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষক সংকটের কারণে উপজেলার অনেক বিদ্যালয়ে নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত নিয়োগ ছাড়া এ সংকট কাটানো সম্ভব নয়।’
সমিতির সভাপতি হারুনুর রশিদ মহালদার বলেন, ‘একটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকলে শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়, শিক্ষার গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এত বিপুলসংখ্যক প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য থাকা উদ্বেগজনক।’
উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ কবির হোসেন বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেড়েছে। তবে শিক্ষক সংকটের কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক এনে পাঠদান চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।’
সদ্য বদলির আদেশ পাওয়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম জাকিরুল হাসান বলেন, ‘নতুন শিক্ষক নিয়োগ হলেই সংকট অনেকাংশে কেটে যাবে। বিষয়টি নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে।’শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন মহলের মতে, প্রাথমিক শিক্ষাই শিশুর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি। অথচ শিক্ষক সংকটের কারণে উপজেলার অনেক বিদ্যালয়ে শ্রেণিভিত্তিক পাঠদান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। দ্রুত শূন্য পদ পূরণ করা না হলে শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতা, ফলাফল এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।প্রাথমিক শিক্ষার ভিত মজবুত করতে দ্রুত শিক্ষক সংকট নিরসন এবং দীর্ঘদিনের শূন্য পদগুলোতে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
