ডা: শাহ্ মোঃ মহিবুল্লাহ (সৌরভ) উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অষ্টগ্রাম কিশোরগঞ্জ।

হাওর অঞ্চলে নিরাপদ মাতৃত্ব ও সিজারিয়ান অপারেশন: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়া অপারেশনের আইনি ও চিকিৎসা ঝুঁকি, সংকট, বাস্তবতা ও টেকসই সমাধান
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকা ভৌগোলিক কারণেই দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের মতো দুর্গম হাওর উপজেলাগুলোতে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোই যেখানে বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে গর্ভবতী মায়েদের জন্য জরুরি প্রসূতি সেবা (EOC) এবং নিরাপদ সিজারিয়ান অপারেশন (LUSCS) নিশ্চিত করা একটি অত্যন্ত জটিল কাজ।
ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা, দক্ষ জনবলের অভাব এবং স্থানীয় জনমানুষের অসচেতনতা মিলে এই অঞ্চলে নিরাপদ মাতৃত্বের অধিকারকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
১. হাওরে সিজারিয়ান অপারেশনের বিদ্যমান প্রটোকল ও বাস্তবতা একটি আদর্শ স্ট্যান্ডার্ড operating প্রসিডিউর (SOP) অনুযায়ী, সিজারিয়ান অপারেশনের তিনটি প্রধান ধাপ রয়েছে: • অপারেশন পূর্ববর্তী ধাপ: অন্তত ৬ ঘণ্টা আগে শক্ত খাবার বন্ধ করা, লিখিত ও আইনসম্মত সম্মতিপত্র (Consent Form) নেওয়া, প্রোফিল্যাক্টিক অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া এবং ইউরিনারি ক্যাথেটার স্থাপন। • অপারেশনকালীন ধাপ: দক্ষ অ্যানেস্থেটিস্ট দ্বারা স্পাইনাল বা এপিডুরাল অ্যানেস্থেসিয়া নিশ্চিত করা, সার্জন কর্তৃক নিখুঁতভাবে ইনসিশন বা কাটা, নবজাতক ও গর্ভফুল (Placenta) বের করা এবং জরায়ুর রক্তক্ষরণ বন্ধ করে দুই স্তরে সেলাই সম্পন্ন করা। • অপারেশন পরবর্তী ধাপ: প্রথম কয়েক ঘণ্টা প্রতি ১৫ মিনিট পর পর ভাইটাল সাইন ও ব্লিডিং মনিটর করা এবং ডিভিটি (DVT) প্রতিরোধে দ্রুত হালকা হাঁটাচলার ব্যবস্থা করা।
অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওটি (OT) অবকাঠামো থাকলেও বাস্তব ক্ষেত্রে এই SOP হুবহু মানা সম্ভব হয় না। এর প্রধান কারণ, প্রত্যন্ত এই অঞ্চলে সার্বক্ষণিক গাইনি কনসালটেন্ট এবং অ্যানেস্থেটিস্টের তীব্র ঘাটতি। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, চিকিৎসকদের আবাসনের অভাব ও রেফারেলে নিজস্ব যানবাহনের ব্যবস্থা না থাকা এই চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
২. বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়া অপারেশনের আইনি ও চিকিৎসা ঝুঁকি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) কড়া নিয়ম অনুযায়ী, গাইনি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রিধারী (FCPS, MS, DGO) সার্জন অথবা বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত EmOC ডাক্তার এবং একজন ডিগ্রিধারী অ্যানেস্থেটিস্ট ছাড়া সিজারিয়ান অপারেশন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিশেষজ্ঞ ছাড়া এই জটিল অপারেশন করলে নিম্নলিখিত প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি হয়: • অনিয়ন্ত্রিত রক্তক্ষরণ (PPH): জরায়ুর সেলাই নিখুঁত না হলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মায়ের তাৎক্ষণিক মৃত্যু হতে পারে। • অঙ্গহানি ও ইনজুরি: জরায়ুর কাটার সময় মূত্রথলি (Urinary Bladder) বা অন্ত্র কেটে যাওয়ার তীব্র সম্ভাবনা থাকে। • অ্যানেস্থেসিয়ার জটিলতা: সঠিক মাত্রায় স্পাইনাল ইনজেকশন না পড়লে রোগীর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা চিরতরে প্যারালাইসিস হতে পারে।
৩. জনচাপ ও মিডিয়া ট্রায়াল: স্বাস্থ্য প্রশাসকের সংকট ও করণীয় দুর্গম হাওরে যখন কোনো মুমূর্ষু প্রসূতি মা আসেন এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের অভাবে তাকে সিজার করা সম্ভব হয় না, তখন স্থানীয় জনতা এবং মিডিয়ার তীব্র চাপের মুখে পড়েন উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসক (UHFPO)। এই সংকটকালীন পরিস্থিতি (Crisis Situation) মোকাবেলায় প্রশাসকের কৌশলগত পদক্ষেপগুলো হবে: • আইনি ঢাল ব্যবহার: বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ছাড়া ওটি পরিচালনা করা আইনত দণ্ডনীয়—এই মর্মে দৃশ্যমান নোটিশ বোর্ড টানানো এবং ওটি বন্ধ রাখার যৌক্তিক কারণ অফিশিয়াল ডায়েরিতে নথিভুক্ত রাখা। • স্বচ্ছ যোগাযোগ (Crisis Communication): মিডিয়া ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের ডেকে দোষারোপ না করে হাসপাতালের প্রকৃত সীমাবদ্ধতা (যেমন: ডাক্তারের শূন্য পদ) এবং বিশেষজ্ঞ ছাড়া অপারেশনের প্রাণঘাতী ঝুঁকিগুলো শান্তভাবে বুঝিয়ে বলা। • প্রশাসনিক ও আইনি ব্যাকআপ: পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন, স্থানীয় ইউএনও (UNO) এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (OC) অবহিত করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। • ঝুঁকিমুক্ত রেফারেল: রোগীকে হাসপাতালে আটকে না রেখে প্রাথমিক চিকিৎসা (First Aid) দিয়ে দ্রুত কিশোরগঞ্জ সদর বা ভাগলপুর জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা।
৪. হাওর অঞ্চলে নিরাপদ সিজারিয়ান সেবা নিশ্চিতের টেকসই উদ্যোগ ভবিষ্যতে হাওর অঞ্চলের মায়েদের ঘরের কাছে নিরাপদ ও নিশ্চিত সিজারিয়ান সেবা দিতে ৪টি দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি: • মানবসম্পদ উন্নয়ন ও ধরে রাখা: হাওরে নিয়োজিত চিকিৎসকদের জন্য আকর্ষণীয় ‘হাওর ভাতা’ ও উন্নত আবাসন নিশ্চিত করা। প্রয়োজনে বড় হাসপাতালের সাথে ‘টেলি-অ্যানেস্থেশিয়া’ প্রটোকল চালু করা। • ডিজিটাল ব্লাড ডোনার ডাটাবেজ: অষ্টগ্রামের স্থানীয় তরুণদের রক্তের গ্রুপসহ একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি রাখা, যেন সিজারের রোগীকে রক্তের জন্য ওটি আটকে রাখতে না হয়। • ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক: বর্ষাকালে দ্রুত রোগী স্থানান্তরের জন্য সার্বক্ষণিক অক্সিজেন ও লাইফ-সাপোর্ট সম্বলিত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সরকারি স্পিডবোট বা নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের স্থায়ী ব্যবস্থা করা। • গর্ভকালীন ট্র্যাকিং (ANC): মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে প্রতিটি গর্ভবতী মায়ের সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ (EDD) ট্র্যাক করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ মায়েদের ১৫ দিন আগেই সদর হাসপাতালের সাথে ম্যাপিং করে রাখা।
হাওর অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই, তবে আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং সদিচ্ছার মাধ্যমে এর ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও প্রসূতি পরবর্তী জটিলতায় দ্রুত ও নিজস্ব রেফারেল বাহন ছাড়া সিজার করার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে যেমন জনমানুষকে বিরত রাখতে হবে, তেমনি দূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমে সংকট মোকাবেলার প্রস্তুতি রাখতে হবে, যা একা স্বাস্থ্য প্রশাসনের জন্য সম্ভব নয়। এই ব্যাপারটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয় নীতিমালা তৈরি করতে হবে।
বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ গাইনী ও এনেস্থিসিয়া চিকিৎসক কে রাখতে হলে ইনসেন্টিভ, আবাসন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যত পদোন্নতির সোপান তৈরী করতে হবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বা অন্যান্য জরুরি সেবায় দূর্গম এলাকার পোস্টিংকে পদোন্নতির জন্য বাধ্যতামূলক পর্ব বা যোগ্যতা ধরা হয়। এছাড়াও রোগী পরিবহনে ২৪/৭ ড্রাইভারসহ নৌ ও স্থল এ্যাম্বুলেন্স এর ব্যবস্থা থাকতে হবে। উপজেলা পর্যায়ের অধিকাংশ চিকিৎসক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিকিৎসক কর্মকর্তাদের দ্বারা পদায়িত হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞ/ কনসালট্যান্ট পদটির পদায়ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে করা হয়। যার ফলে চিকিৎসকসহ অন্যান্য সু্যোগের ব্যাপারে মন্ত্রনালয়ের সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকায় একটি প্রতিবন্ধকতা তৈরী হয়। এই পদায়নটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে করা গেলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো যেতো।
বিশেষায়িত হাওর মাতৃ শিশু সদন ও হাসপাতাল: অষ্টগ্রাম, ইটনা, মিঠামইন এই তিনটি উপজেলায় কোন বেসরকারি হাসপাতাল নেই। যোগাযোগ ব্যবস্থার কারনে বেসরকারিভাবেও মেজর অপারেশন করতে চিকিৎসকরা ঝুকি নেন না। আঞ্চলিক বিভিন্ন দাই দের অপ্রশিক্ষিত প্রসব চেষ্টায় খুব খারাপ অবস্থায় মায়েরা দাইদের দ্বারা সরাসরি ভৈরব বা বাজিতপুরের হাসপাতালগুলোতে কমিশন প্রাপ্তির স্বার্থে রেফার হন। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে প্রশিক্ষিত মিড ওয়াইভ নার্স না থাকায় সংকট আরো ঘোরতর হয়। এই সকল দিক বিবেচনায় হাওরের এই তিনটি উপজেলার মধ্যবর্তী কোন স্থানে বিশেষায়িত একটি হাসপাতাল করা যেতে পারে। যেখানে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যের জন্য প্রশিক্ষিত একের অধিক চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবলের ব্যবস্থা থাকবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুলোতে একজন গাইনি ও একজন এনসিসিয়া চিকিৎসকের পদ আছে। যদি এসব পদে চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়াও হয়, ২৪/৭ একটি জুটির পক্ষে রাত্রিকালীন এবং ছুটির দিনে সিজারিয়ান অপারেশন করা সম্ভব নয়।বেসরকারিভাবে দ্বিতীয় কোন অপশন না থাকায় সার্বক্ষণিক প্রসূতি সেবায় একটি বিশেষায়িত মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য হাসপাতাল তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে ১০০ শয্যার এই ধরনের বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের এই মডেলটিও গ্রহণ করা যেতে পারে।
তবেই অষ্টগ্রামসহ পুরো হাওর অঞ্চলের প্রতিটি মায়ের জন্য নিরাপদ মাতৃত্ব এবং প্রতিটি নবজাতকের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। অন্যথায় অল্প কিছুদিনের জন্য কাউকে প্রতিপক্ষ বা দোষারোপ করে সাময়িক দুঃখ নিরোধ হলেও দীর্ঘমেয়াদি এই সমস্যার কোন সমাধান হবে না।
(এই লেখাটির সিজারিয়ান সেকশনের ধাপ এর বৈজ্ঞানিক রেফারেন্সে AI এবং অবসটেট্রিক্স বইয়ের সাহায্য নেয়া হয়েছে)
ডা: শাহ্ মোঃ মহিবুল্লাহ (সৌরভ) উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অষ্টগ্রাম কিশোরগঞ্জ।
