“পানির নিচ থেইকা ধানের চারা তুইলা আনছি আপনেরে দেখাইবার লাগি, আমার সব শেষ ম্যাডাম”

অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ বোরো ধানক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন উপজেলার হাজারো কৃষক। কৃষকদের এমন দুর্দশার বাস্তব চিত্র সরেজমিনে দেখতে বৃহস্পতিবার তিন উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত হাওর এলাকা পরিদর্শন করেছেন কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মিস সোহানা নাসরিন।সকালে অষ্টগ্রাম উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, জনপ্রতিনিধি ও সুধীজনের সঙ্গে মতবিনিময় সভার মধ্য দিয়ে সফর শুরু করেন জেলা প্রশাসক। পরে তিনি অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনের বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত হাওর এলাকা ঘুরে দেখেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন।পরিদর্শনকালে তিন উপজেলার বিভিন্ন হাওরে দেখা যায়, কয়েকদিন আগেও যেখানে সোনালি ধানের সমারোহ ছিল, সেখানে এখন শুধু থৈ থৈ পানি। কোথাও পানির নিচে ডুবে আছে আধাপাকা ধান, কোথাও কাটা ধানের স্তূপ ভেসে গেছে পানির স্রোতে। কৃষকদের মুখে হতাশা, চোখে অনিশ্চয়তার ছাপ।মিঠামইন উপজেলার ঢাকী ব্রিজ সংলগ্ন হাওর এলাকায় জেলা প্রশাসকের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন ৬৫ বছর বয়সী কৃষক মনু মিয়া। পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমি থেকে ডুব দিয়ে তুলে আনা এক আঁটি ধানের চারা হাতে নিয়ে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন,“ম্যাডাম, তিন একর জমিতে ধান করছিলাম। সব পানির নিচে গেছে। ডুব দিয়া ধানের চারা আনছি আপনেরে দেখাইবার লাগি। অহন না খাইয়া মরতে হইবো। পোলাপাইন লইয়া কীভাবে বাঁচমু?”মনু মিয়ার এই আর্তনাদে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, ঢাকীর উত্তর হাওর, আতপাশা হাওর, মাহমুদপুর হাওর, অষ্টগ্রামের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল এবং ইটনার সিলনী হাওরসহ বিস্তীর্ণ এলাকার শত শত একর জমি পানির নিচে চলে গেছে। অনেক স্থানে কাটা ধানের স্তূপ ডুবে গিয়ে ধানে চারা গজিয়েছে, কোথাও পচন ধরেছে।কৃষকদের অভিযোগ, কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ আগেই সংস্কার করা হলে এ ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমানো সম্ভব হতো। বিশেষ করে ঢাকী-ফুলবাড়িয়া নদীর উত্তর পাড়ের পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ এখনো হুমকির মুখে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আরও নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।ঢাকী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ মিয়া বলেন,“এই অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন বোরো ফসল। কৃষকরা ঋণ করে, জমি বন্ধক রেখে চাষাবাদ করেছেন। এখন সরকার যদি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে তাদের ঘুরে দাঁড়ানো খুব কঠিন হয়ে যাবে।”অষ্টগ্রাম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু বলেন,“হাওরাঞ্চলের কৃষকের জন্য এই ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি তাদের জীবন-জীবিকার ওপর বড় আঘাত। জরুরি ভিত্তিতে প্রণোদনা ও খাদ্য সহায়তা প্রয়োজন।”পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জেলা প্রশাসক মিস সোহানা নাসরিন। তিনি বলেন,“তিন উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার প্রকৃত চিত্র সরেজমিনে দেখেছি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের সহায়তায় সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো সংস্কারের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।”হাওর পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন—এস এম আব্দুল্লাহ বিন শফিক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, মিঠামইন;সিলভিয়া স্নিগ্ধা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, অষ্টগ্রাম;রুহুল আমিন শরীফ, সহকারী কমিশনার (ভূমি), মিঠামইন;ড. সাদিকুর রহমান, উপ-পরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর;মনিরুল ইসলাম, উপ-পরিচালক, খামারবাড়ি, ঢাকা;ওবায়দুল ইসলাম অপু, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, মিঠামইন;মো. মাহবুব আলম, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, মিঠামইন;অভিজিৎ সরকার, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, অষ্টগ্রাম;মোহাম্মদ রুকনুজ্জামান, অফিসার ইনচার্জ, মিঠামইন থানা;ফেরদৌস ফরাজী, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয়তাবাদী কৃষক দল, অষ্টগ্রাম উপজেলা শাখা;এছাড়াও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কৃষক প্রতিনিধি, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।হাওরপাড়ের কৃষকদের এখন একটাই দাবি—ক্ষতির সঠিক মূল্যায়ন করে দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করা হোক। কারণ, এই অঞ্চলের মানুষের কাছে বোরো ফসল শুধু একটি মৌসুমি ফসল নয়; এটি তাদের সারা বছরের জীবনযাত্রার প্রধান ভিত্তি।
