অষ্টগ্রাম ট্রাজেডির ২৩ বছর,

‎২ মিনিটের ঝড়ে নিহত হয়েছিল বর-সহ ৫০ জন।

মোঃ নাদিরুজ্জামান আজমল

‎কিশোরগঞ্জের হাওরবেষ্টিত জনপদ অষ্টগ্রামের ইতিহাসে ২১ এপ্রিল একটি চিরবেদনার দিন। ২০০৩ সালের এই দিনে (৯ বৈশাখ) মেঘনা নদীর বুকজুড়ে ঘটে যায় এক হৃদয়বিদারক লঞ্চডুবির ঘটনা—যেখানে মুহূর্তেই নিভে যায় ৫০টি তাজা প্রাণ। একটি বিয়ের আনন্দযাত্রা পরিণত হয় শোকের অন্তহীন মিছিলে। অষ্টগ্রামের মানুষের কাছে দিনটি আজও এক অমোচনীয় ‘কালো দিবস’।‎ঘটনার দিন অষ্টগ্রামের পরিচিত কাপড় ব্যবসায়ী রামকৃষ্ণ দেবনাথের ছোট ভাই জগদীশ দেবনাথের বিয়েকে কেন্দ্র করে প্রায় ৭০ জন বরযাত্রী ‘এমভি মজলিশপুর’ লঞ্চে করে আশুগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। হাসি, উচ্ছ্বাস আর নতুন জীবনের স্বপ্নে ভরা সেই যাত্রা পৌঁছায় মেঘনা নদীর পানিশ্বর এলাকায় আর ঠিক সেখানেই ভাগ্য নির্মমভাবে বদলে যায়।‎দুপুর আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটে হঠাৎ আঘাত হানে এক প্রলয়ংকরী কালবৈশাখী ঝড়। সময় মাত্র দুই মিনিট কিন্তু সেই দুই মিনিটই যেন হয়ে ওঠে এক যুগের সমান ভয়াবহ। প্রবল বাতাস আর উত্তাল ঢেউয়ের তোড়ে লঞ্চটি ভারসাম্য হারিয়ে মুহূর্তেই তলিয়ে যায় নদীর অতল গহ্বরে। অধিকাংশ যাত্রী কিছু বুঝে ওঠার আগেই পানির নিচে হারিয়ে যান।‎৭০ জন যাত্রীর মধ্যে মাত্র ২০ জন অলৌকিকভাবে প্রাণে বাঁচলেও বাকি ৫০ জনই মৃত্যুর কাছে পরাজিত হন। তাদের মধ্যেই ছিলেন এইচএসসি পরীক্ষার্থী সৈয়দ নিয়াজ হাসান সোহাগ যার সামনে ছিল সম্ভাবনায় ভরা এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, যা নিমেষেই নিভে যায়।‎ বেঁচে ফেরা যাত্রী দীপু ভূঁইয়া (৬১) আজও শিউরে ওঠেন সেই স্মৃতি মনে করে। তিনি বলেন,‎“মনে হয়েছিল পৃথিবীটাই যেন পানির নিচে ডুবে গেছে। চারদিকে শুধু আর্তনাদ আর চিৎকার। আমরা কীভাবে বেঁচে ফিরলাম, সেটা আজও অলৌকিক মনে হয়।”‎দুর্ঘটনার পরপরই শুরু হয় ব্যাপক উদ্ধার অভিযান। বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও নারায়ণগঞ্জের ডুবুরি দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় টানা পাঁচ দিন ধরে চলে তল্লাশি। একে একে উদ্ধার করা হয় ৫০টি নিথর মরদেহ। পুরো অষ্টগ্রামজুড়ে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। একদিনেই অসংখ্য পরিবার হারায় তাদের প্রিয়জন, ভেঙে পড়ে অগণিত স্বপ্ন।‎ সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বর্তমান সদর ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু বলেন,‎ “অষ্টগ্রামের ইতিহাসে এমন মর্মান্তিক ঘটনা আর ঘটেনি। ২৩ বছর পরও সেই শোক আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ক্ষতটা আজও তাজা।”‎তিনি আরও জানান, ওই বিয়েতে নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দাওয়াত ছিল। কিন্তু একই দিনে শপথ অনুষ্ঠান থাকায় তারা যেতে পারেননি। “যদি সেদিন আমরা যেতাম, হয়তো আমরাও সেই মৃত্যুর মিছিলে শামিল হতাম” কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে তার।‎দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রী উকিল আব্দুস সাত্তার, মুফতি ফজলুল হক আমিনী এমপি এবং তৎকালীন বিরোধীদলীয় উপনেতা (পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি) অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা। তারা গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দেন।‎প্রতি বছর ২১ এপ্রিল অষ্টগ্রামবাসী গভীর শ্রদ্ধা, দোয়া ও নীরবতার মধ্য দিয়ে স্মরণ করেন সেই ৫০ জন শহীদসম প্রাণকে। সময় পেরিয়েছে, প্রজন্ম বদলেছে কিন্তু মেঘনার বুক থেকে ভেসে আসা সেই আর্তনাদ আজও থামেনি মানুষের হৃদয়ে।‎ এই ট্রাজেডি শুধুমাত্র একটি দুর্ঘটনা নয় এটি অষ্টগ্রামের ইতিহাসে খোদাই হয়ে থাকা এক স্থায়ী বেদনার নাম। এক শোকগাঁথা, যা সময়ের স্রোতেও মুছে যাবে না কোনোদিন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *