নেক ব্লাস্টে ক্ষতি, জ্বালানি সংকটে বিপাকে অষ্টগ্রামের কৃষক, সরকারি ব্যবস্থাপনায় জ্বালানি সরবরাহের দাবি

মোঃ নাদিরুজ্জামান আজমল

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম হাওরাঞ্চলে বোরো ধানকে ঘিরে দেখা দিয়েছে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। একদিকে ‘নেক ব্লাস্ট’ রোগে ধানের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা, অন্যদিকে ধান কাটার মৌসুম সামনে রেখে জ্বালানি সংকট, দ্বিমুখী চাপে পড়েছেন কৃষকরা।‎‎হাওরজুড়ে এখন বোরো ধান কাটার প্রস্তুতি চলছে। আর মাত্র ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই পুরোদমে শুরু হবে ধান কাটা ও মাড়াই কার্যক্রম। কিন্তু মাঠে গিয়ে অনেক কৃষকই হতাশ হয়ে ফিরছেন। সবুজ ধানের মাঝে দেখা যাচ্ছে শুকিয়ে যাওয়া শীষ, যা ‘নেক ব্লাস্ট’ রোগের লক্ষণ। এতে ধানের শীষ চিটা হয়ে যাচ্ছে, ফলে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।‎‎অষ্টগ্রামের জোয়ান শাহী বড় হাওর, ধোপাবিল, মান্দা, কাইছনা, পাতাইরবন্ধ, চিনাকান্দি, ভাতশালা হাওরসহ বিভিন্ন এলাকায় এ রোগের বিস্তার লক্ষ্য করা গেছে। কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের পর থেকেই ধানক্ষেতে এ রোগ ছড়াতে শুরু করে। বিশেষ করে ব্রি-২৮, ব্রি-২৯, ব্রি-৮৮ ও ব্রি-৭৫ জাতের ধানে বেশি আক্রমণ দেখা যাচ্ছে।‎‎জোয়ান শাহী বড় হাওরের কৃষক খোকন মিয়া জানান, তিনি প্রায় ৬৫ একর জমিতে ধান আবাদ করেছেন। কিন্তু ‘নেক ব্লাস্ট’ রোগে আক্রান্ত হয়ে তার বড় অংশের ফলন হুমকির মুখে। একই হাওরের কৃষক মোঃ রিপন মিয়া ৮ একর জমিতে ধান চাষ করেছেন, তার জমির বেশিরভাগই এ রোগে আক্রান্ত।‎‎মান্দা এলাকার কৃষক মজনু মিয়া বলেন, “ধান ভালো হলে দেনা শোধ করতে পারতাম। এখন অর্ধেক ফলনও পাবো কি না সন্দেহ।” তিনি জানান, ভালো ফলন হলে প্রায় আড়াই শ মণ ধান পাওয়ার আশা ছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আশা অনেকটাই ক্ষীণ।‎‎একইভাবে কৃষক সজিদ মিয়া জানান, তার আড়াই একর জমির ব্রি-২৯ ধান ‘নেক ব্লাস্ট’-এ আক্রান্ত হয়ে অধিকাংশ শীষ সাদা হয়ে গেছে। কৃষকদের অভিযোগ, এ রোগ দমনে মাঠপর্যায়ে এখনো কার্যকর পরামর্শ ও সহায়তা তারা পর্যাপ্তভাবে পাচ্ছেন না।‎‎এরই মধ্যে নতুন করে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট। ধান কাটার মৌসুমে হারভেস্টার, থ্রেশারসহ বিভিন্ন কৃষি যন্ত্র চালাতে প্রয়োজন হয় ডিজেল। কিন্তু হাওরাঞ্চলে বর্তমানে জ্বালানি তেলের সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।‎‎অষ্টগ্রামের একাধিক কৃষক বলেন, “সময়মতো ডিজেল না পেলে মেশিন চালানো যাবে না। তখন ধান কাটতে দেরি হবে, এতে আরও বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।” তারা দ্রুত সরকারি ব্যবস্থাপনায় হাওরাঞ্চলে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান।‎‎অষ্টগ্রাম উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে উপজেলায় ২৪ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে প্রায় ৭০ হেক্টর জমি অনাবাদি থাকলেও অনুকূল আবহাওয়া থাকলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ফলনের আশা করা হচ্ছিল। তবে ‘নেক ব্লাস্ট’ রোগের আক্রমণ এবং জ্বালানি সংকট সেই সম্ভাবনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।

অষ্টগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অভিজিৎ সরকার বলেন, বোরো ধান কর্তন ও মাড়াই কার্যে নিরবিচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য অষ্টগ্রাম উপজেলার তিনজন ডিলার পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা কোম্পানি থেকে বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে ডিজেল সংগ্রহ করবে। খুব শীঘ্রই এ ডিজেল অষ্টগ্রামে আসবে।‎‎

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শফিকুর রহমান জানান, হাওরের বিভিন্ন এলাকায় ‘নেক ব্লাস্ট’ রোগের উপস্থিতির খবর পাওয়া গেছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের পাঠানো হয়েছে। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং কীটনাশক ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে।‎‎তবে কৃষকদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে চলতি মৌসুমে হাওরাঞ্চলের বোরো উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। তাই তারা ‘নেক ব্লাস্ট’ দমন এবং জ্বালানি সংকট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে সরকারি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *