নিকলী উপজেলা প্রতিনিধি

কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত হাওর অঞ্চল নিকলী উপজেলায় বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর পরেই এ অঞ্চলে শুরু হয়,মাটি ব্যাবসায়ীদের অবৈধ ভাবে ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কাটার মহা উৎসব। প্রশাসনের নাকপাশ দিয়ে বিগত আওয়ামী সরকারের সময় থেকে দীর্ঘদিন যাবত মাটির অবৈধ ব্যবসা চলে আসছে। যা এখনো বহমান।
বিষয়টি নিয়ে গুরুই ইউনিয়নের ছেতরা গ্রামের কয়েকজন কৃষকের সাথে কথা হলে পত্রিকায় নাম প্রকাশ না, করার শর্তে বলেন, গুরুই ইউনিয়নের ছেতরার বৈধধার কান্দা থেকে অপরিকল্পিত ভাবে প্রতিবছর ভ্যাকু দিয়ে মাটি কেটে পোড্ডার দুইটি ইটখলায় মাটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জমির মালিকের দের কাছ থেকে কি ভাবে ইটখোলার মালিকেরা মাটি নিয়ে যায় এমন প্রশ্ন করা হলে, উত্তরে বলেন, জমির মালিকদের নিকট থেকে মাটি ক্রয় করার পর তারা ভ্যাকু দিয়ে ৫ থেকে ৬ ফুট গভীর করে মাটি কেটে নিয়ে যায়। ফসলি জমি থেকে যখন মাটি কেটে নিয়ে যাওয়ার ফলে পাশের জমিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জমির আইল ভেঙ্গে পড়ে বোর মৌসুমে এসব জমিতে পানি দেওয়ার পর তা জমিতে থাকে না। পাশের গর্তে পানি নেমে যায়। তাদের দাবী উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হলেও কোন প্রতিকার হয় না। গ্রামের কৃষকদের মতে কৃষিজমির ভবিষ্যৎ উর্বরতা ও উৎপাদনশীলতা মারাত্মক ভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে অতিরিক্ত মাটিবাহী ট্রাক (মাটি খোলা অবস্থায়) চলাচলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সাবমারসিবল হাওরের সড়ক। খোলা অবস্থায় মাটি নিয়ে যাওয়ার সময় ট্রাক থেকে মাটি রাস্তায় পড়ে একাকার হয়ে যায় অল্প বৃষ্টি হলেই সাধারণ যানবাহন এ রাস্তায় চলতে পারে না।
কুর্শা গ্রামের পথচারীদের সাথে কথা হলে, তারা বলেন, মাটি ভর্তি ট্রাক গুলো যখন রাস্তায় চলা ফেরা করে, তখন ধুলায় অন্ধকার হয়ে উঠে পথ ঘাট।
স্কুলগামী কোমলমতি শিশুরা তখন ধুলা বালির স্বীকার হতে হয়। পোড্ডা থেকে নিকলী পর্যন্ত স্কুল, কলেজ, ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাতায়াত করার সময় তারা ধুলাবালিতে আক্রান্ত হয়। কুর্শা গ্রামের শহীদ স্বরনীকা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী শিকা বলেন, স্কুলে যাওয়া আসার সময় রাস্তায় ট্রাক থেকে ধুলা বাতাসের উড়ে এসে আমাদের জামা কাপড় নষ্ট করে দেয় । আওয়ামী লীগের আমলে মাটি যেভাবে কাটা হতো এখনো তাই হচ্ছে। কুর্শা গ্রামের স্থানীয় মানুষ এবং অটো, সিএনজির ড্রাইভারদের সাথে কথা হলে, তারা জানান অবৈধ মাটি কাটার কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে প্রভাবশালী কয়েকটি ইটভাটার মালিক যাদের বিরুদ্ধে গ্রামের ভয়ে কেউ কথা বলতে সাহস পায় না।
২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার বিকালে উপজেলার গুরুই উনিয়নের কুর্শা, হিলোচিয়া হাওরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়। সড়কের পূর্ব পাশে ডজনেরও বেশি এক্সকেভেটর (ভ্যাকু) বেপরোয়া ভাবে হাওরের উপরিভাগের মাটি কেটে হাওরের স্বাভাবিক ভূমিরূপ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে । ফলে এ অঞ্চলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জলাধার নির্ভর মানুষের জীবিকাতেও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত বোঝাই মাটিবাহী ট্রাক চলাচলে সাবমারসিবল সড়কের বিভিন্ন অংশ ডেভে গিয়ে ভেঙে যাচ্ছে।
রাস্তাটি ভেঙ্গে গেলে স্থানীয় হাজার হাজার মানুষকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হবে। বৈশাখ মাসে কৃষকদের হাজার হাজার মণ ধান এ পথ দিয়ে বাড়ি ঘরে তুলতে হয়। সরেজমিনে তদন্ত করলেই অবৈধ মাটি কাটার ব্যাপকতা ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হবে, বলে মনে করেন স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল। তাঁরা দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অবৈধভাবে টপ সয়েল কাটা ও পরিবহন বন্ধ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এ নিয়ে আলোচনা হয়।
এতে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতিকুল ইসলাম তালুকদার হেলিম বলেন, গুরুই হাওরে প্রায় ৫০ টি ট্রাক মাটি নিয়ে যাওয়ার চিত্র প্রত্যক্ষ ভাবে আমার দৃষ্টি গোচর হয়েছে। কিভাবে বা কাদের অনুমোদনে এভাবে মাটি কাটা হচ্ছে, এ ব্যাপারে তিনি প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আরার সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, অবৈধ ভাবে মাটি উত্তলনের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।
