বাড়ি ছেড়ে অজানার পথে দুই শিশু, কুলিয়ারচরের হকারের মানবিকতায় স্বস্তি ফিরল দুই পরিবারে

আহমেদ সিফাত, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:

বাড়ি ছেড়ে অজানার পথে দুই শিশু, কুলিয়ারচরের হকারের মানবিকতায় স্বস্তি ফিরল দুই পরিবারেআহমেদ সিফাত, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:ঢাকায় অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল দুই কিশোর। একজনের মনে ছিল মায়ের বকুনির ভয়, অন্যজন মানসিক চাপে ছিল পড়াশোনা ও টিউশন নিয়ে। অজানা গন্তব্যের উদ্দেশে ট্রেনে উঠে তারা শেষ পর্যন্ত এসে পৌঁছায় কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর রেলওয়ে স্টেশনে। তবে এক হকারের মানবিকতা ও দায়িত্বশীলতার কারণে নিরাপদেই পরিবারের কাছে ফিরতে পেরেছে তারা।জানা গেছে, সানি (১৩) ও তোফায়েল (১৪) পরস্পরের বন্ধু ও প্রতিবেশী। শুক্রবার (৩১ জুলাই) বিকেলে ঢাকার ধানমন্ডি লেকপাড়ে খেলাধুলার সময় সহপাঠীদের সঙ্গে তাদের ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে সানি এক সহপাঠীকে মারধর করলে বিষয়টি পরিবারের কাছে পৌঁছে যাবে ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তার ধারণা ছিল, বাড়ি ফিরলেই মা তাকে শাস্তি দেবেন।অন্যদিকে তোফায়েলের বাবা বাবুল মিয়া একজন রিকশাচালক। কঠোর পরিশ্রম করে সংসার চালানোর পাশাপাশি ছেলেকে লেখাপড়া করিয়ে মানুষ করার স্বপ্নে সম্প্রতি তার জন্য নতুন একটি টিউশনের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু সেই পড়াশোনার চাপই কিশোর তোফায়েলের মনে ভয় তৈরি করে। একপর্যায়ে দুই বন্ধু একসঙ্গে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।ধানমন্ডি থেকে হেঁটে তারা তেজগাঁও রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে যায়। কোথায় যাবে, সে বিষয়ে তাদের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। সামনে যে ট্রেনটি পায়, তাতেই উঠে পড়ে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে তারা কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার কুলিয়ারচর রেলওয়ে স্টেশনে নামে।এদিকে সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর দুই পরিবারে নেমে আসে চরম উৎকণ্ঠা। সানির মা রহিমা আক্তার সুমি সারারাত ছেলেকে বিভিন্ন স্থানে খুঁজে বেড়ান। সানির বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার শিবপুর এলাকায়। বাবা রুমেল মিয়া অনেক আগেই অন্যত্র বিয়ে করে আলাদা সংসার গড়েছেন। দীর্ঘদিন ধরেই একাই সংগ্রাম করে ছেলেকে বড় করে তুলছেন মা। অথচ সেই মায়ের কাছেই ফিরতে ভয় পেয়েছিল ছোট্ট সানি।অপরদিকে তোফায়েলের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামে। রিকশাচালক বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে লেখাপড়া করে প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের চাপই কিশোর মনকে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।রাতের দিকে কুলিয়ারচর রেলওয়ে স্টেশনে দুই কিশোরের অস্বাভাবিক আচরণ দেখে সন্দেহ হয় স্টেশনের হকার হৃদয় মিয়ার। তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলে পুরো বিষয়টি জানতে পারেন। পরে নিজের তত্ত্বাবধানে নিরাপদে রেখে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং জানান, দুই কিশোর সুস্থ ও নিরাপদ রয়েছে।একটি ফোনকলেই যেন দুই পরিবারের উদ্বেগের অবসান ঘটে।শনিবার সকালে সানির মা কুলিয়ারচরে এসে পৌঁছান। পরে কুলিয়ারচর থানা পুলিশের উপস্থিতিতে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে দুই কিশোরকে তার জিম্মায় বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তাদের নিয়ে তিনি বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।ছেলেকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত রহিমা আক্তার সুমি বলেন, “সারারাত আমি ছেলেকে খুঁজেছি। কোথায় আছে, বেঁচে আছে কি না—কিছুই জানতাম না। একজন মায়ের জন্য সেই সময়টা কতটা কষ্টের ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। পরে জানতে পারি, আমার ছেলে কুলিয়ারচরে নিরাপদে আছে। হৃদয় ভাই, কুলিয়ারচর থানা পুলিশ এবং যারা আমার সন্তানকে নিরাপদে ফিরিয়ে দিতে সহযোগিতা করেছেন, তাদের প্রতি আমি আজীবন কৃতজ্ঞ।”কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দিন বলেন, “দুই কিশোরকে নিরাপদে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো শিশু বা কিশোরকে সন্দেহজনক অবস্থায় একা ঘোরাফেরা করতে দেখলে স্থানীয়রা যেন মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করেন। এতে অনেক বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা অপরাধ এড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং তাদের মানসিক অবস্থার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।”স্থানীয়দের মতে, স্টেশনের হকার হৃদয় মিয়ার দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতার কারণেই দুই কিশোর নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পেরেছে। সচেতন মহলের অভিমত, বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের মানসিক চাপ, অভিভাবকদের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক এবং সমাজের মানুষের মানবিক দায়িত্ববোধ—এই তিনটি বিষয় সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কুলিয়ারচরের এই ঘটনাটি সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *