মোঃ নাদিরুজ্জামান আজমল

পবিত্র মহররম মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শোক, ত্যাগ ও আত্মত্যাগের স্মৃতিবিজড়িত দিনগুলোর সূচনা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল অষ্টগ্রাম উপজেলার ঐতিহ্যবাহী হাবেলিবাড়িতে শুরু হয়েছে কারবালার মর্মন্তুদ ইতিহাস স্মরণে জারি-মার্সিয়া পাঠ, মাতম ও শোকানুষ্ঠান।
মহররমের প্রথম দিন থেকেই হাবেলির ইমামবাড়ায় লাল-কালো নিশান উত্তোলনের মাধ্যমে শুরু হয় শোকানুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা।
মঙ্গলবার রাত থেকে জারি-মার্সিয়া পাঠের মধ্য দিয়ে শোকের আবহ আরও গভীর হয়ে ওঠে। সন্ধ্যার পর থেকেই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকা থেকে ধর্মপ্রাণ মুসল্লি, ভক্ত ও দর্শনার্থীরা হাবেলিবাড়িতে সমবেত হতে থাকেন। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জারি দলের করুণ সুরে উচ্চারিত হতে থাকে কারবালার হৃদয়বিদারক ইতিহাস।

ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম বেদনাবিধুর অধ্যায় কারবালার প্রান্তরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) এবং তাঁর পরিবার-পরিজন ও সঙ্গীদের শাহাদাতের ঘটনাকে স্মরণ করেই এ শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। জারি-মার্সিয়ার প্রতিটি পঙ্ক্তিতে ফুটে ওঠে সত্য, ন্যায় ও মানবতার পক্ষে ইমাম হোসাইন (আ.)-এর আত্মত্যাগের মহাকাব্যিক ইতিহাস।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অষ্টগ্রামের শোকাবহ মহররমের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর সহচর সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (রহ.)-এর ১৩তম বংশধর, জোয়ানশাহী পরগণার ন’কোষা জমিদার ও ‘ভাটির ওলি’ খ্যাত হজরত সৈয়দ আব্দুল করিম আল-হোসাইনী (রহ.), যিনি ‘সৈয়দ আলাই মিয়া সাহেব’ নামে অধিক পরিচিত। তিনি জমিদারি ও পার্থিব আভিজাত্য ত্যাগ করে হোসাইনী আদর্শে আত্মনিয়োগ করেন এবং তাঁর অনুসারীদের সত্য, ত্যাগ ও মানবতার শিক্ষা দিয়ে গেছেন।

হাবেলি সূত্রে জানা যায়, মহররমের ১০ দিনজুড়ে ইমামবাড়ায় নামাজ, জারি, মার্সিয়া, মাতম, রোজা পালন, নিরামিষ ভোজন, তাবারক বিতরণ ও বিভিন্ন ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা অনুষ্ঠিত হয়। একইভাবে উপজেলার আটটি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক ইমামবাড়িতেও শোকানুষ্ঠান পালিত হয়।
শোকাবহ মহররমের মূল আয়োজন অনুষ্ঠিত হয় ৯ ও ১০ মহররমে। ৯ মহররম ইমাম হোসাইন (আ.)-এর রুহানী ফায়েজ লাভের উদ্দেশ্যে হাবেলি বাড়ি মাজার প্রদক্ষিণ (গর্স্ত) করা হয়। আর ১০ মহররম পবিত্র আশুরার দিন বাঁশ, রঙিন কাগজ ও কাপড়ে তৈরি তাজিয়া নিয়ে হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে বিশাল শোক মিছিল বের হয়। মিছিলটি স্থানীয় ‘কারবালা’ নামে পরিচিত হাটখলা এলাকায় গিয়ে শেষ হয়।
প্রতিবছর ১ থেকে ১০ মহররম পর্যন্ত লাল-কালো পতাকায় ছেয়ে যায় অষ্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা। শোকানুষ্ঠান উপলক্ষে হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে। আশুরার পরও আরও দুই দিন ধরে চলে শোকের আবহে লোকজ উৎসব ও বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজন।
অষ্টগ্রামের বাসিন্দা আল আমিন বলেন, আমরা বংশপরম্পরায় নবী করিম (সা.)-এর দৌহিত্রদের শোক স্মরণ করে মহররম পালন করে আসছি। ইমাম হোসাইন (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের আত্মত্যাগ ইসলামের পুনর্জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁদের স্মরণ করা আমাদের ঈমানি দায়িত্ব।

এ বিষয়ে অষ্টগ্রাম হাবেলির পীরজাদা ও সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু বলেন, আমরা হোসাইনপন্থি। সত্যের প্রতি সম্মান ও মিথ্যার প্রতি ঘৃণা প্রদর্শনই কারবালার শিক্ষা। মহররম মানুষের মধ্যে ধৈর্য, ত্যাগ, ন্যায়পরায়ণতা এবং সত্যের জন্য জীবন উৎসর্গের প্রেরণা জাগায়।তিনি আরও বলেন, অষ্টগ্রামের এই ঐতিহ্য শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি শতবর্ষের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক চর্চার ধারক। প্রতি বছর বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এখানে এজসে শোকানুষ্ঠানে অংশ নেন।
এদিকে শোকানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। অনুষ্ঠানস্থল ও আশপাশের এলাকায় স্বেচ্ছাসেবকরাও দায়িত্ব পালন করছেন।ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, কারবালার বেদনাময় স্মৃতি এবং শতবর্ষী ঐতিহ্যের সমন্বয়ে অষ্টগ্রামের হাবেলিবাড়িতে শুরু হওয়া এই শোকানুষ্ঠান ইতোমধ্যেই মহররমের আবহকে আরও গভীর করে তুলেছে। সত্য, ন্যায় ও আত্মত্যাগের চিরন্তন আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে এ আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
