“গঙ্গা মা সব বাসাইয়্যা নিছে”‎হাওরের ডুবন্ত ধানক্ষেতে কৃষাণীর কান্না

নাদিরুজ্জামান আজমল

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার হাওরাঞ্চলে অকাল বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া বোরো ধান কাটতে গিয়ে বুকফাটা আর্তনাদ করে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন এক কৃষাণী। জীবন-সংগ্রামের নির্মম বাস্তবতায় স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে বুকসমান পানিতে নেমে ধান কাটতে কাটতেই তিনি বলেন, গঙ্গা মা সব বাসাইয়্যা নিছে। আমাগো আর কিছুই নাই। এইবার পোলা-মাইয়াডারে লইয়া কেমনে বাঁচুম, ভগবানই জানে।
‎বৃহস্পতিবার (৭ মে) অষ্টগ্রাম উপজেলার বাইলাকান্দি হাওরে গিয়ে দেখা যায়, পানির নিচে তলিয়ে থাকা ধানগাছ কেটে কোনোমতে ফসল রক্ষার চেষ্টা করছেন কৃষক ভূষণ চন্দ্র দাস ও তার স্ত্রী রিতা রানী দাস‎রিতা রানী দাস (৩০) উপজেলার কলমা ইউনিয়নের হালালপুর গ্রামের বাসিন্দা। তার স্বামী ভূষণ চন্দ্র দাস শ্রমিক সংকট ও আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে একাই পানিতে ডুবে থাকা ধান কাটছিলেন। স্বামীর এমন কষ্ট সহ্য করতে না পেরে তিনিও বুকসমান পানিতে নেমে ধান কাটায় সহযোগিতা করেন।

‎এ সময় পরিবারের সার্বিক পরিস্থিতির কথা জানতে চাইলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে রিতা রানী দাস বলেন,‎গঙ্গা মা সব বাসাইয়্যা নিছে। আমাগো আর কিছুই নাই। ধানডা যদি ঘরে তুলতে না পারি, এই সংসারডা কেমনে চলব, সেই চিন্তায় বুকডা ফাইট্টা যায়।‎জানা গেছে, তাদের দুই একর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছিল। পরিবারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। এই জমির ফসল ঘিরেই ছিল পুরো বছরের সংসারের স্বপ্ন। কিন্তু হঠাৎ পানি বাড়ায় সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে।‎ভূষণ চন্দ্র দাস জানান, শ্রমিকের মজুরি দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় বাধ্য হয়ে স্ত্রীকে নিয়ে নিজেরাই ধান কাটছেন। তিনি বলেন,
‎শ্রমিক পাই না, আর পেলেও যে মজুরি চায়, তা দেওয়ার অবস্থা নাই। তাই নিজেই পানিতে নামছি, আমার কষ্ট দেইক্কা আমার বউ আমার সাথে বুক পানিতে আইয়্যা আমার সাথে ধান কাটায় সহযোগিতা করতাছে, বলেই কেদে দেন তিনি।
‎অন্যদিকে নিকলী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় কোনো বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়নি। আবহাওয়া কর্মকর্তারা বলছেন, বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে আসায় সামনে বৃষ্টি হলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম হতে পারে‎কৃষি বিভাগের সর্বশেষ তথ্যমতে, হাওরাঞ্চলে এখন পর্যন্ত ৭১ শতাংশ ধান কর্তন সম্পন্ন হয়েছে। নন-হাওর এলাকায় কর্তন হয়েছে ৪০ শতাংশ। তবে এরই মধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে ১৩ হাজার ২শত ৮৭ হেক্টর জমির ফসল এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৬০ হাজার কৃষক

‎হাওরজুড়ে এমন অসংখ্য কৃষক পরিবার এখন একই সংকটে পড়েছে। পানি কিছুটা কমলেও ডুবে থাকা ধান কাটতে গিয়ে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। কৃষকদের দাবি, দ্রুত সরকারি সহায়তা না পেলে অনেক পরিবারই চরম আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *